হোয়াইট হাউজে ফেরার পর আমদানি পণ্যে একের পর এক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এরই মধ্যে চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক কার্যকর হয়েছে। কার্যকরের অপেক্ষায় রয়েছে আরো কিছু ঘোষণা। শুল্ক সম্পর্কিত এ হুমকির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে। একই সময় বেশি মুনাফার জন্য পরিচিত প্রযুক্তি খাতে শেয়ার দরে পতন বাজারে নতুন করে চাপ বাড়িয়েছে। খবর এফটি।
প্রতিবেদন অনুসারে, গতকাল স্টক্স ইউরোপ ৬০০ সূচকের দশমিক ৬ শতাংশ পতন ঘটে। একই সময় জার্মানির রফতানিনির্ভর ড্যাক্স সূচক দশমিক ৯ ও ফ্রান্সের বেঞ্চমার্ক কাক ৪০ সূচক দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।
এশিয়ার বাজারেও সূচকের পতন দেখা গেছে এদিন। এর মধ্যে জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ২ দশমিক ৯, দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি ৩ দশমিক ৪ ও হংকংয়ের হ্যাং সেনগ সূচক ৩ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে চীনের মূল ভূখণ্ডের সিএসআই ৩০০ সূচক ২ শতাংশ কমেছে বলে জানা গেছে।
ইউরোপ ও এশিয়ার শেয়ারবাজারের পতন যুক্তরাষ্ট্রের আগের দিনের প্রবণতা অনুসরণ করেছে। মার্কিন পুঁজিবাজারে সূচকের নিম্নগতিতে নেতৃত্ব দিয়েছে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। এদিন নাসডাক কম্পোজিট ২ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ, ফলে বছরের শুরু থেকে সূচকটির যে পরিমাণ মুনাফা অর্জন হয়েছে তা রাতারাতি হারিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেফরিজের বিশ্লেষক মোহিত কুমার বলেন, ‘গত কয়েকটি দিন অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য যন্ত্রণাদায়ক ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণা এরই মধ্যে দুর্বল হওয়া বাজারকে আরো অস্থির করে তুলেছে।’
গত বৃহস্পতিবার নতুন করে শুল্ক হুমকি দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা বিনিয়োগকারীদের অপ্রস্তুত করে তুলেছে। এদিন তিনি জানান, চীনা আমদানির ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন এবং ৪ মার্চ থেকে কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর শুল্ক চাপিয়ে দেবেন।
জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই চীনের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওই সময় মেক্সিকো ও কানাডার থেকে আমদানি পণ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের কিছু সময় পর তা স্থগিত করলে বাজারে বড় ধরনের প্রভাব এড়ানো সম্ভব হয়। তা সত্ত্বেও বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য একটি নেতিবাচক সংকেত। যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতি। তাই এর নেতিবাচক ভোক্তা আস্থা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন অর্থনীতিকে আরো উদ্দীপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশেষ করে ভোক্তা আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি ছিল তার। কিন্তু চলতি মাসে কনফারেন্স বোর্ডের কনজিউমার কনফিডেন্স ইনডেক্স অনুযায়ী, ভোক্তাদের আস্থা ২০২১ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে বেশি কমেছে।
মার্কিন অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সবলতার প্রশ্নে এখন উদ্বেগ বাড়ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে উচ্চ মূল্যায়ন নিয়ে বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন।
গত দুই বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে লাভজনক হিসেবে বিবেচিত ছিল চিপমেকার এনভিডিয়ার শেয়ার। কিন্তু কোম্পানির চতুর্থ প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) আয় বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছাড়িয়ে গেলেও বাজারে এর প্রভাব পড়েনি। এ সময় কোম্পানির শেয়ার দর কমেছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ দুই বছর ধরে মার্কিন পুঁজিবাজারে বড় ধরনের প্রভাব তৈরি করলেও এনভিডিয়া এখন আগের মতো শক্তিশালী নয়।
ভিসডম ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের ট্রেডিং বিভাগের কো-হেড মাইক জিগমন্টের মতে, এনভিডিয়ার প্রান্তিক আয় ভালো হলেও এতে এমন কিছু ছিল না, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহের বড় জোয়ার সৃষ্টি বা আরো বেশি শেয়ার কেনার জন্য উৎসাহিত করবে।
এদিকে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক চিপের সরঞ্জাম প্রস্ততকারী এএসএমএলের শেয়ারদর গতকাল ৩ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। এর অর্থ হলো পুঁজিবাজারে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর দুর্দশা ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়েছে।
গত নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী বিজয় মার্কিন শেয়ারবাজারে আশাবাদ তৈরি করেছিল। তখন ধারণা করা হয়েছিল, নতুন প্রশাসন ব্যবসাবান্ধব অর্থনৈতিক নীতি প্রবর্তন করবে। কিন্তু এখন বিনিয়োগকারীরা মার্কিন অর্থনীতির জন্য সম্ভাব্য হুমকিগুলোর দিকে নজর দিচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের পতন ঘটেছে।
সাধারণত শেয়ারবাজারে পতনের সময় শেয়ার কেনার জন্য এগিয়ে আসে খুচরা বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু তারা এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘অস্বস্তি’ অনুভব করছেন। বিষয়টি জানিয়েছে খুচরা ট্রেডিং বিষয়ে তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থা ভান্ডাট্র্যাক।
ব্যাংক অব আমেরিকার পুঁজিবাজারবিষয়ক কৌশলবিদ উইকি উর মতে, বাজারের পতন বা সংশোধন একটি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়া। এ সময় বিনিয়োগকারীরা তাদের মুনাফা তুলে নেন। ফলে শেয়ারের দাম কিছুটা কমে যেতে পারে। বাজার প্রায়ই দীর্ঘমেয়াদি বা পাঁচ বছরের একটি পরিসরের ঘটনাকে মাত্র কয়েক দিনের নিরিখে মূল্যায়ন করতে চায়। এটি বাজারের অস্থিরতা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রকৃতির প্রতিফলন।
এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে বিনিয়োগকারীদের পিছু হটার প্রভাব ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গতকাল বিটকয়েন ৫ শতাংশ ও ইথেরিয়ামের মূল্য ৬ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।